কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শান্ত ছায়াঘেরা এক প্রান্তিক জনপদে জন্ম নেওয়া একটি মুখ আজ অনেক নারীর অনুপ্রেরণার নাম—তিনি সোনিয়া আফরিন। সাংবাদিকতা, শিক্ষা, নৈতিকতা আর আত্মত্যাগে গড়া এই নামটি শুধু হোমনার গণ্ডি পেরিয়ে আজ নারী জাগরণের প্রতীক।
👧 শৈশব: বাবার স্মৃতি, মায়ের ছায়া
সোনিয়ার শৈশব ছিল বর্ণিল, আবার কষ্টেরও। তিনি যখন জীবনের পথে হাঁটতে শুরু করলেন, তখনই হারালেন তাঁর প্রিয় পিতা মরহুম আজগর আলী ওরফে আনু মিয়াকে। পিতৃহীন সংসারে মা হলেন তার সবচেয়ে বড় আশ্রয় ও অনুপ্রেরণা। সেই মায়ের দোয়া আর আদর্শের ছায়াতলেই সোনিয়া বড় হয়েছেন শক্ত মেরুদণ্ড নিয়ে।
📚 শিক্ষাজীবন: দারিদ্র্য পেরিয়ে দীপ্ত জ্যোতিষ্ক
প্রথম আলো জ্বলে ওঠে ২০১৫ সালে—কারিগরি বিভাগ থেকে হোমনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ। এরপর ২০১৮ সালে মানবিক বিভাগে হোমনা সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। তিনি কখনো থেমে থাকেননি।
পড়াশোনার প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার স্বীকৃতি আসে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে দর্শন বিভাগে অনার্সে প্রথম বিভাগ, এরপর ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তরে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তার মুখে তখন একটি বাক্য:
“পরিশ্রম বিফলে যায় না। মেয়েদেরও স্বপ্ন দেখতে হবে, সেই স্বপ্নে ঘাম ঝরাতে হবে।”
📰 সাংবাদিকতা: কণ্ঠস্বরহীনদের কণ্ঠস্বর
পড়াশোনার পাশাপাশি সোনিয়া গড়ে তুলেছেন এক বিশুদ্ধ সাংবাদিক পরিচিতি। তিনি দৈনিক যায় যায় দিন এবং কুমিল্লা নিউজ ২৪ এর হোমনা প্রতিনিধি। সেইসাথে তিনি হোমনা প্রেসক্লাবের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তার লেখনীতে উঠে আসে নিপীড়িত মানুষের কথা, নারীর অধিকার, এবং সমাজের অনিয়মের প্রতিবাদ। তিনি শুধু কাগজে কলমে সাংবাদিক নন—তিনি এক প্রতিবাদী নারী সাংবাদিক হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
🕋 বিশ্বাস, মমতা ও ত্যাগ
শিক্ষাজীবনে থেকেই ধর্মচর্চা ও মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ তাকে এগিয়ে নেয় নতুন এক পথের দিকে। তিনি নিজ মাকে নিয়ে পবিত্র মক্কা-মদিনা সফর করে ওমরা হজ্জ পালন করেন। একজন কন্যা তার পিতার স্মৃতি বুকে ধারণ করে মায়ের ইচ্ছাপূরণে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।
🎯 স্বপ্ন: বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা
সোনিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার হয়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো। মায়ের ইচ্ছেই তার জীবনের দিকচিহ্ন হয়ে উঠেছে। সব বাঁধা পেরিয়ে সেই লক্ষ্যে তিনি এখনো সংগ্রামী।
তিনি বলেন—
“আমি শুধু নিজের জন্য নয়, গ্রামের মেয়েদের জন্য, সমাজের জন্য কাজ করতে চাই। মায়ের চোখে হাসি ফোটাতে চাই। আমি দোয়া চাই সবার কাছে, যেন মহান আল্লাহ্ আমাকে সেই জায়গায় পৌঁছাতে কবুল করেন।”
💫 উপসংহার:
সোনিয়া আফরিন—এই নামটি কেবল একজন সাংবাদিক, শিক্ষার্থী বা মেয়ে নয়—তিনি এক আলোকবর্তিকা, যিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে হার না মানা মনোভাব, মায়ের আশীর্বাদ, আর নৈতিকতা মানুষকে কত দূর নিয়ে যেতে পারে।
যেখানে অনেকেই থেমে যায়, সোনিয়া সেখানেই বলে ওঠেন—
“আমি এখনো শুরুই করিনি, পথ অনেক বাকি।”