নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঞ্ছারামপুর | ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে পূর্ব শত্রুতা ও পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে এক প্রবাসীর স্ত্রী ও তার স্কুলপড়ুয়া সন্তানের ওপর বর্বরোচিত হামলার খবর পাওয়া গেছে। সন্ত্রাসীরা কেবল মা ও ছেলেকে কুপিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, তাদের বসতবাড়িতে চারটি তালা ঝুলিয়ে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে গুরুতর আহত ওই নারী ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে (NITOR) চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত:
ভুক্তভোগী রোমা আক্তারের ভাষ্যমতে, অনন্তরারামপুরের আব্দুল আজিজের সাথে তার ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। পাওনা টাকা ফেরত চাওয়া এবং স্থানীয় একটি বিয়ে সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আব্দুল আজিজ ও তার সহযোগীরা রোমার ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। এর জের ধরেই গত ২৮ এপ্রিল পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়।
বর্বরোচিত হামলা ও অবর্ণনীয় নির্যাতন:
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হামলার প্রথম পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা রোমার অনুপস্থিতিতে তার বাড়িতে চড়াও হয়। তার নবম শ্রেণী পড়ুয়া ছেলে আব্দুল্লাহকে ঘুম থেকে তুলে কানের ওপর হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ঘরে চারটি তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে রোমা আক্তার বাঞ্ছারামপুর থেকে ফেরার পথে বাঁশগাড়ি স্টিল ব্রিজের উত্তর পাশে সন্ত্রাসীরা তাকে অটো থেকে নামিয়ে রামদা ও হাতুড়ি দিয়ে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। আব্দুল আজিজ ও রুবেলের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী তাকে মাটিতে ফেলে পিষে দেয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার পা ও হাতে গুরুতর জখম করে। স্থানীয়রা এগিয়ে আসতে চাইলে সন্ত্রাসীরা তাদেরও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
নেপথ্যে রাজনৈতিক মদতের চাঞ্চল্যকর তথ্য:
তদন্তকালে এই পৈশাচিক হামলার নেপথ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে:
মদতদাতার অভিযোগ: পুরো ঘটনাটি উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুবদলের আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ আকাশের মদতে ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফোনে নির্দেশনা: ভিকটিম জানিয়েছেন, তাকে মারধর শুরু করার আগে প্রধান অভিযুক্ত রুবেল হারুনুর রশিদ আকাশের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। ফোনে হারুনের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর থেকেই তার ওপর নৃশংস হামলা শুরু হয়।
নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ: হামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রুবেল অন্তত চার-পাঁচবার হারুনুর রশিদ আকাশের সাথে ফোনে কথা বলে পরিস্থিতির আপডেট দেন এবং নির্দেশনা গ্রহণ করেন।
টাকা আত্মসাতের পরিকল্পনা: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, ভিকটিমের পাওনা ২৭ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই হারুনুর রশিদের নির্দেশে এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়।
চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থা:
আহত রোমা আক্তারকে প্রথমে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ‘শারীরিক নির্যাতন’ (Physical Assault) হিসেবে চিহ্নিত করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) রেফার করেন।
পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসাপত্র ও এক্স-রে রিপোর্ট অনুযায়ী, রোমার ডান পা ও হাতের হাড় ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে (Open Fracture)। হাসপাতালের ডিসচার্জ সার্টিফিকেটে তার ডান হাতের মধ্যমা আঙ্গুলের হাড় ভেঙে যাওয়ার (Open Fracture of Proximal Phalanx of Rt Middle Finger) বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তার পায়ে বড় ধরণের অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা রয়েছে।
অভিযুক্তদের পরিচয়:
ভুক্তভোগী পরিবার হামলার জন্য সরাসরি কয়েকজনকে অভিযুক্ত করেছেন। তারা হলেন:
১. আব্দুল আজিজ (অনন্তরারামপুর)
২. রুবেল (কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী)
৩. ফয়সাল
৪. শারপিন
৫. মোবারক ও বিল্লাহ সহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন।
প্রশাসনের ভূমিকা ও আইনি প্রক্রিয়া:
বাঞ্ছারামপুর মডেল থানা পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছে। হাসপাতাল থেকে দেওয়া টিকেটেই এটিকে ‘পুলিশ কেস’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার পঙ্গু হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এদিকে, হামলার পর থেকে অভিযুক্তরা পলাতক রয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় এলাকাবাসী এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত মূল হোতা ও ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
তথ্যসূত্র:
ভিকটিম রোমা আক্তারের জবানবন্দি
ভিকটিমের ছেলে আব্দুল্লাহর বক্তব্য
ভিকটিমের বোন রুনা আক্তারের বক্তব্য
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল (NITOR) এর ডিসচার্জ ও কেস সামারি
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহিঃবিভাগীয় টিকিট
ভিকটিমের এক্স-রে ও শারীরিক জখমের স্থিরচিত্র