নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঞ্ছারামপুর: শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছানোর গল্প আমরা অনেক শুনেছি, কিন্তু ঘরের পাশের চেনা পরিবেশে নিজের সংগ্রামের মাধ্যমে ইতিহাস গড়ার উদাহরণ খুব কমই মেলে। তেমনই এক জীবন্ত কিংবদন্তি বাঞ্ছারামপুরের উজানচর কংশ নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক তপন চন্দ্র সূত্রধর। যে বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসে একদিন অভাব আর প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে তিনি অ আ ক খ শিখেছেন, আজ সেই বিদ্যাপীঠেরই অভিভাবক হিসেবে তিনি আলো ছড়াচ্ছেন।
সংগ্রামের শুরু ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার খোশকান্দি পঞ্চপুর গ্রামে ১৯৬৮ সালে এক সাধারণ কাঠমিস্ত্রি পরিবারে তপন চন্দ্র সূত্রধরের জন্ম। তাঁর পূর্বপুরুষরা এই বিদ্যালয়েরই কৃতি ছাত্র ছিলেন। কিন্তু দাদাদের অকাল মৃত্যু এবং দেশভাগের টালমাটাল পরিস্থিতিতে পরিবারটি চরম অভাবের মুখে পড়ে। তাঁর বাবা লেখাপড়ার সুযোগ না পেলেও সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার এক অদম্য জেদ বুকে লালন করতেন।
একাত্তরের স্মৃতি ও শৈশব
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় তাঁর পরিবারকে। ঘরবাড়ি ফেলে প্রাণের ভয়ে শরণার্থী হিসেবে তাঁরা আশ্রয় নেন ভারতে। যুদ্ধের সেই কঠিন দিনগুলোতে গুহায় আশ্রয় নেওয়া আর যুদ্ধের বিভীষিকা নিজের চোখে দেখা তপন চন্দ্র যুদ্ধের পর দেশে ফিরে দেখেন তাঁদের ভিটেমাটি সব ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই শুরু হয় নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই।
অদম্য ছাত্রজীবন: মাইল মাইলের পর মাইল পথ চলা
তপন চন্দ্র সূত্রধরের ছাত্রজীবন ছিল এক চরম পরীক্ষার ক্ষেত্র। বর্তমানে যাতায়াতের সুব্যবস্থা থাকলেও সত্তরের দশকে বাড়ি থেকে উজানচর স্কুলে আসার একমাত্র উপায় ছিল মাইলের পর মাইল পায়ে হাঁটা। বর্ষাকালে নৌকা চালিয়ে স্কুলে আসতে হতো এবং প্রায়শই সকালে না খেয়েই ক্লাসে হাজিরা দিতে হতো তাঁকে। অভাব এতই তীব্র ছিল যে, কলেজে পড়ার সময় এক জোড়া জুতা কেনার সামর্থ্যও তাঁর পরিবারের ছিল না। লুঙ্গি পরে খালি পায়েই তিনি কলেজে যাতায়াত করতেন।
গণিতে দুর্বলতা থেকে গণিতের শিক্ষক হওয়া
মজার বিষয় হলো, আজ যিনি গণিত গবেষণাগার তৈরি করে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন, ছাত্রজীবনে তিনি সেই গণিতেই ছিলেন ভীষণ দুর্বল। শিক্ষকরা তাঁকে বিজ্ঞান ছেড়ে মানবিক বিভাগে পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং নিজের মেধা ও কঠোর পরিশ্রমে সেই গণিতেই বোর্ড পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে তাক লাগিয়ে দেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর এবং উত্তরা ইউনিভার্সিটি থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
কর্মজীবন ও সমাজ সংস্কার
১৯৮৭ সালে রামকৃষ্ণপুর কে কে আর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের শুরু। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় হোমনা কফিলুদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথে শিক্ষকতা করার পর ২০১৫ সালে তিনি নিজ বিদ্যালয় উজানচর কংশ নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বিদ্যালয়ে তিনি শুধু শিক্ষার মানোন্নয়নই করেননি, বরং শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক গণিত গবেষণাগার স্থাপন করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তরুণদের জন্য বার্তা
তপন চন্দ্র সূত্রধর মনে করেন, বয়স বা অভাব কখনো মানুষের স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না। তিনি বলেন, "মানুষের সদিচ্ছা আর অদম্য চেষ্টা থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব"। তাঁর জীবন আজ বাঞ্ছারামপুরের হাজারো শিক্ষার্থীর কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
https://thedailyprabaha.com
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫