দেশের অন্যতম মাদক ও চোরাচালান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে সীমান্তবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা। ভারতীয় ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে প্রায় ৩৪ কিলোমিটার সীমান্ত থাকায় পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর ও সিঙ্গারবিল ইউনিয়ন ঘিরে গড়ে উঠেছে সুসংগঠিত মাদক চক্র। প্রতিদিনই এই সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে ইয়াবা, ফেন্সিডিল, গাঁজা, স্কফ সিরাপ ও বিদেশি মদসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য মতে, উপজেলায় ৫৫০ থেকে ৬০০ জন মাদক কারবারি সক্রিয় থাকলেও স্থানীয়দের মতে এই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। ১৮-২০টি সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করে মাদকের চালান ছড়িয়ে পড়ছে সড়ক, রেল ও নৌপথে রাজধানীসহ সারা দেশে।
হকার-বৃদ্ধ সেজে মাদক পরিবহন
হরষপুর, মুকুন্দপুর ও আজমপুর রেলস্টেশন ব্যবহার করে ভিক্ষুক ও হকার সেজে চলছে মাদক পরিবহন। বর্ষাকালে নৌপথ, আর শুষ্ক মৌসুমে সড়কপথে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে পৌঁছে যাচ্ছে বিপুল মাদক।
উপজেলার ৩২০ থেকে ৩৫০টি স্পটে গড়ে উঠেছে খুচরা মাদক বিক্রির আড্ডা, যেখানে আশপাশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, সরাইল, নাসিরনগর, আশুগঞ্জ, নবীনগর ছাড়াও কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছে মাদকসেবীরা।
নারীদের ব্যবহার
মাদক পরিবহনে নারীদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। কেউ মাদকের অর্থ লগ্নি করছেন, কেউ পাহারা দিচ্ছেন, কেউবা নিজেই শরীরের বিভিন্ন স্থানে মাদক লুকিয়ে পরিবহন করছেন।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও কমিশনের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এ চক্রে সহযোগিতা করছেন এবং কমিশন নিচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মাদক ব্যবসায়ী জানান,
> “এই ব্যবসা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও শুরুতে লাভজনক মনে হয়। তবে কিছুদিন পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন পক্ষকে ভাগ দিতে দিতে লাভ থাকেই না।”
মামলা থেকে বাঁচতেই মাদকের পথ
অনেকে বলেন, মাদক ব্যবসা থেকে ফিরতে চাইলেও তাদের সুযোগ দেওয়া হয় না। কেউ একবার মামলার আসামি হলে, ভবিষ্যতে যেকোনো চালান আটক হলেই তার নামেই মামলা দিয়ে দেওয়া হয়। এতে তারা বাধ্য হয়ে ফের চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন।
থানা পুলিশের অবস্থান
বিজয়নগর থানার ওসি মো. শহিদুল ইসলাম বলেন,
> “মাদক নির্মূলে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মাদক জব্দ ও অপরাধী গ্রেফতার করা হচ্ছে।”
পরিসংখ্যান ভয়াবহ
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিজয়নগর থানায় ৮৬টি মাদক মামলা হয়েছে।
গ্রেফতার: ৭৫ জন
জব্দ:
৭১১ কেজি গাঁজা
১২৮৬ পিস স্কফ সিরাপ
৬২৮ বোতল ফেন্সিডিল
৭২ বোতল বিদেশি মদ
১৮,৮৯০ পিস ইয়াবা
বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের কালাছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু ইউছুফ ভূঁইয়া বলেন,
“এখনকার নারী-পুরুষ সবাই কোনো না কোনোভাবে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চল মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে।”
📢 বিশেষ অনুরোধ: প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি, নতুবা সীমান্তে তৈরি হওয়া এই ‘মাদক করিডর’ হয়ে উঠবে জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ বিপদ।
📌
দৈনিক প্রবাহ | সম্পাদনা বিভাগ
https://thedailyprabaha.com
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫